রমজানে রোজা রেখে শরীর ঠিক রাখার চমৎকার ১০টি উপায়
রমজানে রোজা রেখে শরীর ঠিক রাখার চমৎকার কয়েকটি উপায় সম্পর্কে জানাতে আমি আপনাদের মাঝে আজকে এই পোস্টটি নিয়ে উপস্থিত হয়েছি। আশাকরি আমার এই পোস্টটি পড়ে আপনারা সিয়াম সাধনার মাস রমজান মাসে নিজের শরীরকে ঠিক রাখতে পারবেন।
আপনারা জানেন রমজান একটি সিয়াম সাধনার মাস। এই মাসে সবচেয়ে বড় এবাদত রোজা রাখা। সেজন্য রোজা রেখে শরীরটাকে ঠিক রাখা খুবই কষ্টসাধ্য একটি বিষয় হয়ে পড়ে অনেকের কাছে। আমার এই পোস্টটি সময় নিয়ে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়লে আপনারা আপনার শরীরকে ঠিক রাখতে পারবেন।
এই পোস্টে যা যা থাকছেঃ রমজানে রোজা রেখে শরীর ঠিক রাখার চমৎকার উপায়
- রমজান মাসের পরিচিতি
- রমজানে রোজা রাখার নিয়ম-কানুন
- সেহরির নিয়ত রমজানে রোজা রাখার ক্ষেত্রে
- রমজানের রোজা রাখার জন্য ইফতারের দোয়া
- রমজানে রোজা রেখে শরীর ঠিক রাখার ১০টি উপায়
- রমজানে রোজা ভাঙ্গার কারণসমূহ
- রমজানের রোজা রাখলে শরীরের উপকারিতা
- রমজানের রোজা রাখার ক্ষেত্রে এড়িয়ে চলা বিষয়সমূহ
- রমজানের রোজা না রাখলেও চলবে এমন ব্যক্তিবর্গগণ
- রমজানে রোজা রেখে শরীর ঠিক রাখার চমৎকার উপায় নিয়ে লেখকের মন্তব্য
রমজান মাসের পরিচিতি
রমজান মাসের পরিচিতি সম্পর্কে প্রত্যেক মুসলমানকে জানা প্রয়োজন। এই মাসটি ইসলাম ধর্ম অনুসারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং পবিত্র একটি মাস। এটি হিজরি বর্ষপঞ্জির নবম মাস, যা মুসলমানদের জন্য রোজা রাখার মাস হিসেবে পরিচিত। এই মাসে ১২ বছরের ঊর্ধ্বে প্রত্যেক মুসলমানকে প্রতিদিন সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার যৌনসংগম থেকে বিরত থাকে।
এছাড়াও এই মাসে মুসলমানরা আত্মসংযম, ইবাদত-বন্দেগি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য বিভিন্ন ইবাদত করে থাকেন। আপনি নিশ্চয় জানেন এটি ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের মধ্যে একটি। এই মাস সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “রমজান মাসই হলো সে মাস, যে মাসে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এই মাসটি পাবে, তারা যেন রোজা রাখে।” (সূরা আল-বাকারাঃ ১৮৫)
এছাড়াও এই মাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বরকতময় রাত রয়েছে যাকে লাইলাতুল কদর বলা হয়। এই রাত সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বলেন, “নিশ্চয়ই আমি কদর রাতে কুরআন অবতীর্ণ করেছি। আর আপনি জানেন কি, কদরের রাত কি? কদর রাত 1000 মাসের চেয়ে উত্তম।” (সূরা আল কদর-১-৩)
রমজানে রোজা রাখার নিয়ম-কানুন
রমজানে রোজা রাখার নিয়ম-কানুন রয়েছে, যা আপনাকে অবশ্যই মেনে চলতে হবে। সাধারণত সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল ধরনের পানাহার শারীরিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা রোজার অন্যতম শর্ত। এছাড়াও আরো কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে আসুন সেগুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক-
রোজা রাখার ক্ষেত্রে প্রথমে আপনাকে নিয়ত করা জরুরি। নিয়ত সাধারণত মনে মনে করলেই হয়, তবে মুখে উচ্চারণ করেও করা যায়। রাসূল (সাঃ) বলেন, “কোন আমল নিয়ত ছাড়া গ্রহণযোগ্য নয়।” সেজন্য আপনাকে প্রতিদিন রোজার জন্য মন থেকে নিয়ত করা গুরুত্বপূর্ণ। রোজা শুরু হয় সেহরি খাওয়ার মাধ্যমে। যার সম্পর্কে নবীজি বলেন, “সেহরির মধ্যে বরকত রয়েছে, তাই তোমরা সেহরি খাও।”
সেহরি সবসময় সুবহে সাদিকের আগে শেষ করতে হয় এবং পরে পানাহার ও খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হয়। এ সময় বিভিন্ন ধরনের খারাপ কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে হয়। দিনশেষে সূর্যাস্তের পর রোজা ভাঙ্গার সময় হয়, যা ইফতার নামে পরিচিত। রাসুল (সাঃ) বলেন, “মানুষ তখন পর্যন্ত কল্যাণের মধ্যে থাকবে, যতক্ষণ তারা ইফতারে তাড়াহুড়া করবে।” সেজন্য সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই ইফতার করা উত্তম।
সেহরির নিয়ত রমজানে রোজা রাখার ক্ষেত্রে
সেহরির নিয়ত রমজানে রোজা রাখার ক্ষেত্রে প্রত্যেক মুসলমানকে জেনে রাখা আবশ্যক। সুবহে সাদিকের আগেই সেহরির খাবার খাওয়ার পর রোজার নিয়ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন আসুন জেনে নেওয়া যাক সেহরির নিয়তটি-
“নাওয়াইতু আন আসুমা গাদাম মিন্ শাহরি রমাজানাল মূবারাকি ফারদাল্লাকা, ইয়া আল্লাহু ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নিকা আনতাস সামিউল আলিম।” অর্থ - হে আল্লাহ, আমি আগামীকাল পবিত্র রমজানের তোমার পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরজ রোজা রাখার নিয়ত করলাম। তুমি আমাকে কবুল করো, নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বজ্ঞানী।
আপনাকে মনে রাখতে হবে সেহরি শুধু রোজা রাখার শারীরিক প্রস্তুতির অংশ নয়, এটি আত্মিক শক্তি অর্জনেরও একটি সুযোগ। তাই এই সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত, যেন তিনি আপনাকে রোজা রাখার তৌফিক দান করেন এবং এটি সহজ করে দেন। সেহরির সময় বেশি বেশি ইস্তেগফার, দুরুদ শরীফ ও দোয়া করা গুরুত্বপূর্ণ।
রমজানের রোজা রাখার জন্য ইফতারের দোয়া
রমজানের রোজা রাখার জন্য ইফতারের দোয়া আপনাকে অবশ্যই জানতে হবে। সারাদিন সংযম পালনের পর সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে রোজা ভাঙতে হয়। তবে একটি জিনিস মনে রাখবেন, ইফতার করার আগে দোয়া পড়া সুন্নত ও ফজিলতপূর্ণ। এখন আসুন জেনে নেওয়া যাক ইফতার করার সময় কোন দোয়াটি পড়তে হবে-
“আল্লাহুম্মা সুমতু লাকা ওয়া তা-ওয়াক্কালতু আলা রিযক্বীকা ওয়া আফতারতু বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমীন।” অর্থ - হে আল্লাহ, আমি তোমার জন্য রোজা রেখেছি এবং তোমার রিজিক দ্বারা ইফতার করছি। এছাড়াও আরেকটি সংক্ষিপ্ত দোয়া রয়েছে - “জাহাবায যামাউ, ওয়াবতাল্লাতিল উরূকু, ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ।
রমজানে রোজা রেখে শরীর ঠিক রাখার ১০টি উপায়
রমজানে রোজা রেখে শরীর ঠিক রাখার কয়েকটি উপায় সম্পর্কে আপনার জানার প্রয়োজন রয়েছে। যেহেতু রমজান মাসের দিনগুলোতে দীর্ঘ সময় রোজা রাখতে হয় তাই শরীর ঠিক রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্য আপনাকে নিয়মিত ব্যায়ামের পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। আসুন রমজান মাসে রোজা রেখে শরীর ঠিক রাখার ১০ টি উপায় সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক-
- আপনাকে শরীর ঠিক রাখার জন্য অন্যান্য মাসের মত রমজান মাসেও নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। রমজান মাসে ব্যায়াম করা সঠিক ও উত্তম সময় হচ্ছে ইফতারির আগে। সেজন্য ইফতারের প্রায় ২ ঘণ্টা আগে হালকা ব্যায়াম করে নিবেন।
- ব্যায়াম নির্বাচনের ক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই অল্প পরিশ্রমযুক্ত ব্যায়াম নির্বাচন করতে হবে। কারণ রমজান মাসে এমনিতেই শরীর ক্লান্ত হয়ে থাকে। সে হিসাবে আপনি যদি আধাঘন্টা/এক ঘন্টা হাটাহাটি করেন তাহলে কার্যকারী হবে।
- হালকা ব্যায়াম করতে যদি সমস্যা না হয় তাহলে প্রতিদিন নিয়মিত করুন। আর যদি ব্যায়াম করা অবস্থায় মাথা ব্যথা অথবা দুর্বল অনুভব করেন তাহলে সাথে সাথে সেদিনের জন্য ব্যায়াম করা থেকে বিরত থাকেন।
- আপনি শারীরিকভাবে ফিট থাকলেও মনে রাখবেন রোজা আপনার শরীরকে কিছুটা দুর্বল করে দিবে। সেজন্য প্রতিদিন খাদ্য মেনুতে পুষ্টিকর খাবার রাখবেন।
- প্রতিদিন নিয়মিত পরিমিত আকারে সেহরি করবেন। সেহরিতে আমিষ জাতীয় খাবারের তুলনায় শর্করা জাতীয় খাবার বেশি করে খাবেন। কখনোই পেট ভরে খাবেন না। খাবারের তুলনায় পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন। সম্ভব হলে একটি দেশীয় ফল সেহরির মেনুতে রাখবেন।
- গরমের সময় বিশেষ করে দুপুরের সময় যতটা সম্ভব বাইরে না থেকে ঘরে থাকার চেষ্টা করবেন। বৃষ্টিতে কখনোই ইচ্ছা করে ভেজার চেষ্টা করবেন না, কারণ এতে ঠান্ডা জাতীয় সমস্যা এবং সর্দি-কাশি, জ্বর হতে পারে।
- হালকা খাবার দেহে সব সময় ইফতার করুন। পানি জাতীয় খাবার বেশি করে পান করুন। ভাজাপোড়া এবং অতিরিক্ত খাবার থেকে বিরত থাকুক।
- চা-কফি পান না করাই উত্তম, কারণ এতে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে।
- ইফতারের আনুমানিক ৩০ মিনিট পর ১৫ হতে ২০ মিনিট বাইরে হাঁটাহাঁটি করুন। এতে হজম শক্তি বৃদ্ধি পাবে।
- পানির অপর নাম জীবন তাই বেশি বেশি পানি পান করুন। দিনে অন্তত আট গ্লাস পানি পান করার চেষ্টা করুন। এটি দেহের পানিশূন্যতাকে কমাবে এবং দেহকে সুস্থ রাখবে।
- সেহরির সময় আপনি যদি ডাবের পানি পান করেন তাহলে দিনের বেলায় তা শরীরে পানির অভাব পূরণ করবে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবে, ক্লান্তি দূর করবে এবং মাথাব্যথা সমস্যা থেকে মুক্তি দিবে।
- সেহরি ও ইফতারের সময় আপনি যদি ফলের রস পান করেন তাহলে আরো ভালো হবে।আপনার শরীর হাইড্রেটেড হবে এবং রোজা করার জন্য শারীরিক ও মানসিক শক্তি পাবেন।
রমজানে রোজা ভাঙ্গার কারণসমূহ
রমজানে রোজা ভাঙ্গার কারণসমূহ সম্পর্কে আপনাকে অবশ্যই জানতে হবে। সিয়াম ও সাধনার মাস রমজানে রোজা হচ্ছে সর্বোত্তম ইবাদত। সেজন্য সর্বোত্তম ইবাদতটি যেন ভেঙ্গে বা মাকরুহ না যায়, সে সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। যে ব্যক্তি রমজান মাসে রোজা রাখবে না বা ভঙ্গ করবে তার জন্য জান্নাতে প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়বে। সেজন্য আসুন জেনে নেওয়া যাক রোজা ভঙ্গের কারণ সমূহ সম্পর্কে-
- আপনি যদি ইচ্ছা করে বমি করেন।
- বমি করার পর মুখের ভেতরে লেগে থাকা খাবারের অংশগুলোর কিছু অংশ যদি গিলে খাওয়া হয়।
- মেয়েদের ক্ষেত্রে মাসিক ও সন্তান প্রসবের পর ঋতুস্রাব হলে।
- রোজা থাকা অবস্থায় ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করলে।
- আপনি যদি হঠাৎ শারীরিক অসুস্থতার জন্য গ্লুকোজ বা শক্তিবর্ধক ইনজেকশন বা সেলাইন নিলে।
- আপনার রোগের মাত্রা বেড়ে যাওয়া সাপেক্ষে প্রসব-পায়খানার রাস্তা দিয়ে যদি ওষুধ বা অন্য কিছু প্রবেশ করানো হয়।
- আপনি যদি কান বা নাক দিয়ে ওষুধ প্রবেশ করেন।
- রোজা থাকা অবস্থায় অন্য কেউ আপনাকে যদি জোর করে কিছু খাওয়ায়।
- ইফতারের সময় হয়েছে এই ভেবে যদি আপনি আগেই ইফতারি করেন।
- আপনি যদি ভুলবশত কিছু খেয়ে ফেলেন এবং মনে করেন রোজা ভেঙ্গে গেছে। তারপর আরো কিছু খেলে তখনই আপনার রোজা ভেঙ্গে যাবে। তবে ভুলবশত খাওয়ার সাথে সাথে আপনি যদি ফেলে দেন আর কিছু না খান তাহলে রোজা হয়ে যাবে।
- বৃষ্টির পানি যদি মুখে পড়ে এবং সেটার কিছু অংশ যদি খেয়ে নেন।
- জিহ্বা দিয়ে দাঁতের ফাঁকে থাকা কোন খাদ্যের কিছু অংশ রোজা থাকা অবস্থায় খেয়ে ফেললে।
- আপনার বমির কিছু অংশ মুখে এসে গেলে তা বাইরে ফেলে না দিয়ে খেয়ে ফেললে।
- রোজা থাকা অবস্থায় আপনি অজু করার সময় গুলি বা নাকে পানি দেওয়ার সময় ভেতরে পানি চলে গেলে।
রমজানের রোজা রাখলে শরীরের উপকারিতা
রমজানের রোজা রাখলে শরীরের উপকারিতা সম্পর্কে জানলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। রমজান মাস মূলত ৩ টি খন্ডে বিভক্ত রহমত, বরকত এবং নাজাত। এই মাসটি প্রত্যেক মুসলিম মানুষের জন্য উপকার বয়ে নিয়ে আসে। এই মাসে আপনি যদি রোজা রাখেন এবং সাথে সাথে অন্যান্য ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পালন করেন তাহলে শরীরে কোন অপকারিতা পরিলক্ষিত হবে না। আসুন জেনে নেওয়া যাক রমজান মাসে রোজা রাখায় শারীরিক উপকারিতা সম্পর্কে-
- যেহেতু রমজান মাস একটি রোজা রাখার মাস সেহেতু দিনের বেলায় কম খাওয়ার জন্য শরীরে কিছু জটিল সমস্যা যেমন হাই কোলেস্টেরল, হাই ব্লাড প্রেসার, হার্টের সমস্যা, অতিরিক্ত ওজন ইত্যাদি কমার সম্ভাবনা থাকে।
- প্রায় সব বাসায় ইফতারিতে খেজুর থাকেই। খেজুর সাধারনত একটি অতি উচ্চ পুষ্টিসম্পন্ন ফল। এতে ফাইবার এবং কার্বোহাইড্রেট থাকায় হজমে সহায়তা করে। এছাড়াও খেজুরে আরো অনেক গুণাগুণ রয়েছে ফলে অনেকেই যারা সেহরির সময় খেতে পারেন না তারা খেজুর খেয়ে রোজা রাখার চেষ্টা করে।
- রোজা মানেই না খেয়ে থাকা ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজের ধরনে সামান্য পরিবর্তন আসে। বৈজ্ঞানিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, রোজা মস্তিষ্কের কোষ গঠনে সাহায্য করে। রোজা রাখার কারণে অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে উৎপন্ন হরমোন কটিসলের পরিমাণ কমার জন্য মানসিক চাপ কমে যায়।
- রোজা রাখার ফলে পাকস্থলী সংকুচিত হয় ফলে অল্প পরিমাণ খাবার খেলে তা পূর্ণ মনে হয়। এর কারণে যাদের শরীর অতিরিক্ত মোটা তারা তাদের ওজন কমাতে সক্ষম হবে।
- আপনার যদি কোন দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাস যেমন ধূমপান করা, অতিরিক্ত চা কফি খাওয়া চর্বি জাতীয় খাদ্য গ্রহণ করা ইত্যাদি রমজান মাসে রোজা রাখার কারণে কমে যাবে। ফলে আপনি ইচ্ছা করলেই রমজানের পরে সেগুলোকে বাদ দিয়ে আদর্শ জীবনযাপন করে ভালো অভ্যাস গড়ে তুলতে পারবেন।
- আপনি যদি রমজান মাসে রোজা রাখেন তাহলে আপনার আয়ু বাড়বে কারণ এটি বার্ধক্যের কারণ জনিত নানা সমস্যার সাথে যুদ্ধ করে। এটি সাধারণত রমজান মাসের সম্ভব কারণ দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা থেকে রমজান মাস এমন একটি মাস যখন আপনি একটি নিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রায় মাসটি পার করবেন।
- আপনি এ মাসে রোজা থাকার কারণে আপনার জিহ্বা ও লালাগ্রন্থী বিশ্রাম পায়। অনেকক্ষণ পর খাবার পেলে এই গ্রন্থিগুলো সক্রিয় হয়ে উঠে। বেশিক্ষণ না খেয়ে থাকায় খাওয়ার ইচ্ছাও বেড়ে যায়, ফলে অরুচির সমস্যা কমে যায়।
রমজানের রোজা রাখার ক্ষেত্রে এড়িয়ে চলা বিষয়সমূহ
রমজানের রোজা রাখার ক্ষেত্রে এড়িয়ে চলা বিষয়সমূহ দিকে আপনার দৃষ্টি রাখতে হবে। এই মাসটি সাধারণত অন্যান্য মাসের থেকে অন্যরকমভাবে জীবন যাপন করতে হয়। সেজন্য এই মাসে কিছু কিছু বিষয় আপনাকে পরিহার করতে হবে। যে সকল বিষয়গুলো পরিহার করে রোজাকে সুন্দরভাবে ও সুস্থভাবে শেষ করা যায় তা সম্পর্কে আসুন জেনে নেয়া যাক-
অতিরিক্ত খাওয়াঃ এই কাজটি আপনি সেহরি অথবা ইফতার দুটি সময়েই মেনে চলতে হবে। আপনি যদি শুরুতেই অর্থাৎ সেহরির সময় বেশি খেয়ে নেন তাহলে সারাদিন বদহজম অথবা পেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সারাদিন অনাহারে থাকার পর ইফতারের সময় বেশি খাবার খেলেও বদহজম ও পেটের সমস্যা হতে পারে।
তৈলাক্ত, ওদের চিনি ও লবণযুক্ত খাবার খাওয়াঃ অধিকাংশ মুসলমানদের দেখা গেছে যে, এই মাসে তৈলাক্ত খাবার, মিষ্টি জাতীয় খাবার এবং অধিক লবণযুক্ত খাবারের উপর ঝোঁক বেশি থাকে। এসব খাবারগুলোতে ক্যালোরির পরিমাণ অত্যাধিক থাকে। সারাদিন রোজা রাখার পর খাবারগুলো সাময়িক সময়ের জন্য মুখরাচর ও ভালো লাগলেও পরের দিন রোজা রাখতে কঠিন হয়ে পড়বে।
সেহরি খাওয়ার ব্যাপারে উদাসীনতাঃ আপনি যদি ইফতার ও তার পরবর্তী সময়ে পরিমিত খাবারের চেয়ে বেশি খেয়ে থাকেন তাহলে অথবা রাত্রে দেরি করে ঘুমালে সুবহে সাদিকের সময় ঘুম থেকে উঠতে ও খেতে আগ্রহ থাকবে না। ফলে এটি আপনার পরবর্তী দিনের দৈনন্দিন কার্যকলাপে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এমনও হতে পারে পরের দিন রোজা করার উৎসাহ বা শারীরিক অবস্থা হারিয়ে ফেলবেন।
অতিরিক্ত চা এবং কফি গ্রহণঃ অন্যান্য মাসের মত এই মাসেও যদি আপনার চা এবং কফির উপর আগ্রহ থেকে থাকে তা কমিয়ে আনতে হবে। কারণ অতিরিক্ত চা এবং কফি পান করলে প্রসাবের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা আপনার রোজা রাখার সময় পানি শূন্যতার অনুভূতি প্রকাশ পাবে। তবে ইফতারের পর পরই আপনি ইচ্ছা করলে এক কাপ চা বা কফি পান করতে পারেন, যা আপনার শরীরকে উত্তেজিত করবে।
ফ্রিজে রাখা পানি ও কোমল পানীয় গ্রহণঃ সেহরি অথবা ইফতার, কোন সময়ই ফ্রিজে রাখা পানি ও কোমল পানীয় গ্রহণ করবেন না। সেহরির সময় ফ্রিজে রাখা পানি পান করলে আপনার পাকস্থলী ও অন্ত্রে রক্ত চলাচল কমে যাবে। ফলে আপনার হজম ও অ্যাসিডিটির সমস্যা দেখা দিতে পারে। কোমল পানীয় ইফতার ও সেহরি দুই সময়তেই পরিহার করুন, কারণ এটি অস্বাস্থ্যকর।
দাঁত ব্রাশ না করাঃ আপনি যদি সেহরি খাওয়ার পরে দাঁত ব্রাশ না করেন তাহলে দাঁতের যেমন বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে তেমন আপনার রোজা ভঙ্গের কারণও হতে পারে। অনেক সময় দেখা গেছে সেহরি খাওয়ার পরে দাঁতের ফাঁকে অনেক খাবারের অংশ আটকে থাকে। আপনি যদি ব্রাশ না করেন তাহলে দিনের বেলায় খাবারের অংশটি পেটের চলে যেতে পারে।
গোসল না করাঃ নাক, কান বা মুখে দিয়ে পানি পেটে চলে যাবে এবং রোজা ভেঙ্গে যাবে এই ভেবে আপনি যদি গোসল না করেন তাহলে রমজান মাসে দিনের পবিত্রতা থেকে আপনি বঞ্চিত হবেন। গোসল আপনার শরীরকে শীতল করবে এবং রোজা রাখতে সাহায্য করবে। সেজন্য নিয়মিত দিনের একটি সময় অবশ্যই গোসল করতে হবে।
অতিরিক্ত পরিশ্রমঃ যেহেতু আপনি রোজা রাখছেন সেহেতু দিনের বেলায় অতিরিক্ত পরিশ্রম থেকে বিরত থাকুন। বিশেষ করে দুপুরের সময় সূর্যের তাপ অতিরিক্ত থাকায় আপনি যদি সে সময় পরিশ্রম বেশি করেন তাহলে আপনার শরীরের পানিশূন্যতা বেড়ে যাবে। ফলে রোজা রাখা আপনার জন্য কষ্ট হয়ে যাবে।
অতিরিক্ত সময় শুয়ে বা বসে থাকলেঃ রোজা রাখার অজুহাতে আপনি যদি অতিরিক্ত সময় ধরে শুয়ে অথবা বসে পার করেন তাহলে সেটি শরীরের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। হাঁটাহাঁটি এবং চলাফেরা না করলে পায়ের এবং কোমরের পেশিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে ফলে শরীরে অনেক সমস্যা দেখা দেয়। সেজন্য রোজা রেখে নিয়মিত পরিমিত আকারে দৈনন্দিন কাজ করবেন।
অনিয়মিত ঘুমঃ শরীরকে সুস্থ রাখতে প্রতিদিন সর্বনিম্ন ৬ ঘন্টা ঘুমানো উচিত। সেজন্য আপনাকেও রমজানে ঘুমের পরিমাণটা ঠিক রাখতে হবে। সেজন্য আপনাকে তারাবির নামাজের পরপরই ঘুমাতে হবে কারণ সেহরীর সময় উঠতে হবে এবং খাওয়া-দাওয়া করতে হবে। অনিয়মিত ঘুমের কারণে গ্যাসের সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা রোজা করতে সমস্যার সৃষ্টি করে। তবে ভরা পেটে না ঘুমানো উত্তম।
রমজানের রোজা না রাখলেও চলবে এমন ব্যক্তিবর্গগণ
রমজানের রোজা না রাখলেও চলবে এমন ব্যক্তিবর্গগণ সম্পর্কে আপনাকে অবশ্যই জানতে হবে। কিছু ব্যতিক্রম ব্যক্তিবর্গ ছাড়া প্রাপ্তবয়স্ক সব মুসলমানেরই এ মাসে রোজা করা ফরজ। এখন আসুন জেনে নেওয়া যাক কোন কোন ব্যক্তিবর্গের ক্ষেত্রে রোজা না রাখলেও চলবে-
- আপনি যদি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করেন তাহলে আপনার কষ্ট হলে রোজা নাও রাখতে পারেন। এসব ব্যাক্তিবর্গকে মুসাফির বলা হয়। সাধারণত ৪৮ মাইল বা ৭৭ কিলোমিটার এর উপরে ভ্রমণ করলে এটি প্রযোজ্য হবে। তবে রমজান মাস পরে আপনাকে অবশ্যই বাদ দেওয়া রোজার বকেয়া রোজা করতে হবে।
- এমন অনেক মানুষ আছে যাদের রাখার কারণে জটিল রোগ সৃষ্টি অথবা পুরাতন রোগ বৃদ্ধির প্রবণতা থাকে, এমনকি মৃত্যুর আশঙ্কাও থাকে। সেক্ষেত্রে তিনি রমজান মাসে রোজা না রাখলেও চলবে। তবে তাকে অবশ্যই রোজার কাফফারা আদায় করতে হবে।
- বার্ধক্যজনিত কারণে যেসব ব্যক্তি রোজা রাখতে অক্ষম এবং রোজা রাখলে যাদের বার্ধক্য জনিত বিভিন্ন অসুখের ঔষধ খেতে সমস্যা হবে তাদের রমজান মাসের রোজা না রাখলেও চলবে। তবে বছরের যে কোন সময় সুস্থতা অনুভব করলে রমজানের রোজা বকেয়া হিসেবে তুলে নিতে হবে।
- আপনি যদি গর্ভবতী হয়ে থাকেন তাহলে নিজের কিংবা সন্তানের প্রাণহানি বা মারাত্মক স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কা থাকলে আপনার রোজা না রাখলে চলবে। তবে বছরের যে কোন সময় সুস্থতা থাকলে সে সময় বকেয়া হিসেব বাদ পড়া রোজাগুলো করে নিতে হবে।
- রোজা রাখার কারণে আপনার যদি সন্তানকে দুধ পান করাতে সমস্যা হয় তাহলে সন্তানের দিকে তাকিয়ে রোজা না রাখলেও চলবে। তবে বছরের যেকোনো সময় আপনাকে অবশ্যই বকেয়া রোজাগুলো করে নিতে হবে।
- মহিলাদের মাসিক পিরিয়ড এবং সন্তান জন্মদানের পরবর্তী ৪০ দিন রোজা না রাখলেও চলবে। তবে পিরিয়ড ভালো হওয়ার সাপেক্ষে এবং সন্তানের ৪০ দিন পার হওয়া ও নিজের সুস্থতার সাপেক্ষে বছরের যে কোন সময় বকেয়া রোজাগুলো করে নিতে হবে।
- রমজান শুরুর তিন মাস আগে আপনার যদি মারাত্মক হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়ে থাকে অথবা প্রায়সময়ই হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয় তাহলে আপনার রমজান মাসে রোজা না রাখলেও চলবে।
- খাবারের অনিয়মের কারণে আপনার যদি ডায়াবেটিসের মাত্রা বাড়তে থাকে তাহলে আপনার রোজা না রাখলেও চলবে।
- আপনি যদি হঠাৎ খুব গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
- রিজিকের জন্য আপনি যদি খুব শারীরিক পরিশ্রম করে থাকেন তাহলে আপনার রোজা না রাখলেও চলবে তবে চেষ্টা করতে হবে শারীরিক পরিশ্রমের মাত্রা কমিয়ে রমজান মাসে রোজা রাখার।
- যাদের নিয়মিত ডায়ালাইসিসি করতে হয় অথবা যারা কিডনি সমস্যায় ভুগছেন তাদের ক্ষেত্রে রোজা না রাখলেও চলবে।
- জটিল হৃদরোগ ও পক্ষাঘাতগ্রস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে রোজা না রাখলেও চলবে। তবে সুস্থতা সাপেক্ষে পরবর্তীতে অবশ্যই বকেয়া রোজা করে নিতে হবে।
- মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিবর্গকে ওষুধ সেবনের উদ্দেশ্যে অথবা মানসিক ভারসাম্য বজায় না রাখতে পারা ব্যক্তিগণকে রমজান মাসের রোজা না রাখলেও চলবে।
রমজানে রোজা রেখে শরীর ঠিক রাখার চমৎকার উপায় নিয়ে লেখকের মন্তব্য
রমজানে রোজা রেখে শরীর ঠিক রাখার চমৎকার উপায় সম্পর্কে আমি একটি কথাই বলবো, এই মাসটি শুধু ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের মাস নয়, বরং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাস আপনার জন্য হতে পারে। রোজা রাখার ফলে আপনার শরীরে পানি ও ক্যালোরি পরিমাণ কমে যায়।
যার কারণে আপনার হয়তো দুর্বলতা, ক্লান্তি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে এই সমস্যাগুলো এড়িয়ে চলতে এবং রমজান মাস জুড়ে ঠিক থাকতে আপনাকে নিয়মিত কয়েকটি রুটিন এর মধ্য দিয়ে জীবনকে পরিচালিত করতে হবে। আপনি যদি এই মাস থেকেই অভ্যাস গ্রহণ করেন তাহলে পরবর্তী মাসগুলোতে আপনার অভ্যাসগুলো শরীর খুব সহজভাবেই মেনে নিবে।
আমি পোস্টে চেষ্টা করেছি রোজার বিভিন্ন দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করার। ধর্মীয় দিক দিয়ে এই মাছটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এই মাসে শরীরকে ভালো রাখার কয়েকটি টিপস, শরীরের জন্য উপকারিতা, সেহরি ও ইফতার সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আশা করি পোস্টে আপনাদের কাজে লাগবে এবং নিয়মিত সঠিকভাবে মাসটি ব্যবহার করলে আপনার শরীরকে সুস্থ রাখতে পারবেন।
আশাকরি রোজা রাখার সময় যে পরামর্শ গুলো এখানে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো মেনে চলার চেষ্টা করবেন এবং রমজান মাসে রোজাকে উপভোগ করবেন। আজ এই পর্যন্তই ভবিষ্যতে এই পোষ্টের কোন আপডেট অথবা নতুন কোন পোস্ট নিয়ে আপনাদের মাঝে হাজির হব।
সে পর্যন্ত সবাই সুস্থ থাকবেন, ভালো থাকবেন এবং রমজান মাসে অবশ্যই রোজা রাখবেন। ধন্যবাদ সবাইকে......
অজানা আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url